This article was written by me following the death of Udayan Ghosh at the behest of the Bengali daily Sangbad Pratidin. They will probably publish an edited version as this is too long for them. Here is the full version for those readers of this blog site who can read Bengali. This article liberally uses words, lines and names of titles of Udayan Ghosh’s own works. Hence, readers already familiar with the works of Udayan Ghosh will be better able to appreciate this essay.
অবস্কিওর উদয়ন বনাম
নতুন উষার উজ্জ্বল উদয়ন!
অর্জুন সেন
মানুষ উদয়ন ঘোষ সম্পর্কে লিখতে হলে প্রথমেই লিখতে হয় তিনি একজন লেখক ছিলেন। আর তখনই, এক নিশ্বাসে লিখতে হয় তিনি একজন কমিউনিস্টও ছিলেন। তাকে নিয়ে লিখতে হলে পক্ষে-বিপক্ষের কথা অনিবার্যভাবে এসে যায় কারণ কমিউনিস্ট উদয়ন ঘোষ, মানুষের পক্ষে ছিলেন, এবং তাদের বিপক্ষে ছিলেন যারা এই সুন্দর পৃথিবীটাকে ব্যক্তি মালিকানার লোভে হাইজ্যাক করে মানুষকে, এবং সাথে সাথে এই পৃথিবীর সকল প্রাণীর বেঁচে থাকাকে বিপর্যস্ত করে ধ্বংসকারী এক উৎপাদন ও সমাজ ব্যবস্থার হর্তা কর্তা হয়ে বসে আছেন। যারা সবই নিজের সাম্রাজ্য মনে করে আসলে লুন্ঠনকেও লিগাল ইনকামে পরিনত করেছেন।
তার প্রতিটি লেখাই ছিল এক যুদ্ধ ঘোষনা অথবা এক অঘোষিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। মানুষের পক্ষ নিয়ে অমানবিক যা কিছু তার বিপক্ষে। ঐ বন্দুকের নল থেকেই একদা তার গদ্যের সৃষ্টি হয়। তার পেন ছিল যেন এক বন্দুক যার ঘোড়া টিপে তিনি লেখা সৃষ্টি করতেন। তার প্রতিটি শব্দ, বাক্য, গদ্য বা পদ্য ছিল অমানবিকদের হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশ্যে কামান দাগা।
তিনি শিক্ষকও ছিলেন। বাংলার অধ্যাপক হয়ে অধ্যাপনার সূত্রে ছাত্রদের নম্বর পাইয়ে দিতে প্লট, পিপল, কনটেন্ট এবং ফর্ম নিয়ে সংজ্ঞা অনুযায়ী বিস্তর কথা নিজের জীবদ্দশায় বলেছেন কিন্তু নিজের লেখালেখির মধ্যে দিয়ে আসলে, এই সব প্লট, কনটেন্ট এবং তার সহোদর সেই শৌখিন মেজাজি ফর্মকে ডেলিবারেটলি ভেঙেচুরে, শব্দকে হত্যা করে, উপমাকে হত্যা করে, রূপকল্পকে হত্যা করে, গল্পকে হত্যা করে, জীবনকে হত্যা করে অমর লেখা সৃষ্টি করে বহু মানুষকে লিখতে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন কিভাবে লেখন শৈলীতে ডায়ালেক্টিকাল হয়ে মানুষের পক্ষ নিয়ে লিখতে হয় অমানবিকদের বিপক্ষে। শিখিয়েছেন কিভাবে এক একটি শব্দ একএকটি বুলেট হতে পারে যা মৃত্যু ঘটায় অমানবিক মনন ও কৃষ্টির, জন্ম দেয় এক মানবিক সাহিত্য-সংস্কৃতির।
বাংলা এবং বাংলা সাহিত্যে পন্ডিত ছিলেন তিনি কিন্তু সমাজ বিজ্ঞান বা অর্থনীতিতেও অনেক পন্ডিতের ঘাম ছুটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন কারন তাত্তিক কমিউনিস্ট হিসাবে তাকে এই সব বিষয়গুলি নিয়ে পড়াশুনা করতে এবং সদা সজাগ থাকতে হত ঐ অনিবার্য কারনেই। তাই তিনি কমিউনিজমেরও শিক্ষক ছিলেন এবং নিজে হাতে তৈরী করেছেন বহু কমিউনিস্ট। ঐ কমিউনিস্ট হবার সুবাদেই প্রচুর পান্ডিত্য ও গভীর গবেষণার ভিত্তিতে তিনি যখন ‘বাংলা সাহিত্যে রাজ সভার প্রভাব’ শিরোনামে তার পিএইচডি থিসিস জমা করলেন তা প্রত্যাক্ষিত হল অশ্লীলতার দায় – তখনই আবার হাতে নাতে প্রমাণ পেলেন সাহিত্য আর রাজনীতির গভীর সম্পর্ক।
প্রিয় পাঠক ক্ষমা করবেন যে মানুষ উদয়ন ঘোষকে নিয়ে লিখতে গিয়ে বারংবার তার লেখালেখি এবং তার কমিউনিজমের কথা লিখতে হবে, কমিউনিস্ট কচকচির কথা লিখতে হবে, পক্ষে-বিপক্ষের কথা লিখতে হবে। মানুষ উদয়ন ঘোষ সিকিউরড সার্ফেসে থাকলেও, লেখক উদয়ন ঘোষ বিপক্ষের গোলাগুলির মাঝে পোকা পিঁপড়ের কামড় খেয়ে পড়ে থাকতেন ফকস্হোলে আন্ডারগ্রাউন্ডে।
লেখক উদয়ন ঘোষ, নাকি মানুষ উদয়ন ঘোষ, যিনি আদ্যন্ত পলিটিক্যাল অ্যানিমাল তাই কমিউনিস্ট উদয়ন ঘোষ, গুলিয়ে যায় কারন তিনি আদ্যন্ত ডায়ালেকটিকাল, হাড় হতে দেখতে পেতেন, হাড় হাভাতেও দেখতে পেতেন। স্পর্শকাতর হাংরিদের আখের গোছানোর সারমর্মহীন গরীব-প্রেম বা প্রীতি নিয়ে লিখতে গিয়ে রাগে তার রগ ফুলে যেত। হাংরিদের এই স্পর্শকাতরতা নিয়ে তার লেখা পড়লে পরিষ্কার হয়ে যায় পেটি বুর্জুয়া মানে কি, আর এই পেটি বুর্জুয়া সাহিত্য-সংস্কৃতিই বা কি। তার সেই লেখা একবার পড়েই চিনতে শিখি কে শত্রু আর কে মিত্র, অন্তত সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে, লেখালেখির জগতে।
তিনি হাড় হাভাতেদের দেখতে পেয়েও চর্ব-চোষ্য খেতেন, দুপুরে খাবার শেষে প্ল্যান করতেন রাত্রে কি খাবেন। তাজ হোটেলে একদিন খাব বলে ভেবেছিলেন এবং খেয়েওছিলেন হাড় হাভাতেদের মত যারা কখনই চর্ব-চোষ্য খেতে পাননা। তিনি শেখাতেন কমিউনিস্ট হওয়া মানে সব মানবিক প্রবৃত্তির উর্দ্ধে গিয়ে, সব গ্রিভান্স ভুলে গিয়ে, তার প্রিয় স্বপনের মত স্যাক্রিফাইস করা নয়, কারণ হাড় হাভাতে কমিউনিস্টদের প্রকৃত অর্থেই কিছুই নেই, তাই স্যাক্রিফাইস করার বা হারানোরও কিছু নেই। তাদের শুধু চাইবার আছে, পাওয়ার আছে, ছিনিয়ে নেওয়ার আছে। কমিউনিস্টরা রসগোল্লা খেতে চায় কারন তারা মালিক হতে চায় এই গোটা পৃথিবীর সকল সম্পদের। ব্যক্তি মালিকানা, এবং বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্ট্যাটাস কুয়ো মেনে নিয়ে ইলেকশনের পর ইলেকশনে গরিবদের বোকা বানিয়ে তাদের, ঐ গরিবদেরই, “গনতান্ত্রিক” অনুমতি নিয়ে শোষন চালিয়ে যাওয়ার রাজনীতি যারা করেন তারা কখনই “কমিউনিস্ট” হতে পারেননা, বিপ্লবী তো নয়ই।
তিনি শেখাতেন বিপ্লব মানে কিছু মানুষের ভালো থাকা ও আর সকলের খারাপ থাকার বিরুদ্ধে একটি অভিযান, একটি রক্তাক্ত, হিংসাত্মক যুদ্ধ। বিপ্লব হল গরিবদের ঐ ভাল থাকা কিছু মানুষের চামড়া গুটিয়ে তাই দিয়ে জুতো বানানোর এক ধরনের ইচ্ছা তাই বিপ্লব কোনো প্রদর্শনী অথবা ম্যাজিক নয়। বিপ্লব কোনো রুমালের এমব্রয়ডারিও নয়।
তিনি শেখাতেন On Contradiction পড়। জানবে যেখানেই অন্ধকার, সেইখানেই আলো আসবেই একদিন। জানবে, এ দুনিয়ায় যেমন মরুভুমি আছে, তেমনি আছে সমুদ্র। তেমনি মালিক আছে, আর আছে গোলাম। Antagonistic। ঐসব relation আদ্যন্ত antagonistic। একই পয়েন্টে থিসিস – অ্যান্টিথিসিস।
তাই তিনি লিখেছেন Spring thunder। নকশালবাড়ি। History is linked to the class struggle. It is never neutral – never above the battle। আমি ঐ শ্রেণী সংগ্রামে যাব, যাদুকর, আমি দেশব্রতী হব, আর ম্যাজিক না, এবার real reality-কে ধরব। এই যে দেশের মানুষ বলে, জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনি। এই যে সে বল্ল, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এ সবের পর সে যে স্বপ্ন দেখে কেড়ে খাবার – তা magic নয়? তোমার নকশালবাড়ি magic reality নয়?
তার লেখালেখিই ছিল তার কমিউনিস্ট প্র্যাকটিস তাই তিনি পেশাদারি লেখক কোনোদিনই হতে পারেন নি, জনপ্রিয়তো নয়ই কারণ জনপ্রিয় ঘুম পাড়ানো পপ সাহিত্য সংস্কৃতি যারা করেন তাদের লেখালেখির শ্রেণি চরিত্র আমাদের, হাড় হাভাতেদের, মেহনতি মানুষের জানা আছে। যারা পেশাদারি লেখালেখি অথবা সাংবাদিকতা করতে গিয়ে হা হুতাশ করেন যে শত শোষনেও এই হাড় হাভাতেদের, এই কমিউনিস্টদের কেন এত অভিযোগ আছে, কেন তাদের সব চেয়ে বড় সমস্যা হল তাদের শুধু গ্রিভান্স আছে (বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বপন দাসগুপ্ত একটি বড় পত্রিকায় ইদানিং লিখেছেন) এবং স্বপ্ন দেখেন যে গরিবরা তাদের সব শোষন সংক্রান্ত গ্রিভান্স ভুলে এনটারটেইনিং জনপ্রিয় সাহিত্য সস্কৃতিতে মশগুল হয়ে বিপ্লব ভুলে থাকবেন, যাদের আপসেও নেই আপত্তি বলে রুজি রোজগারের জন্য রফা করেছেন দুহাতের আঙুলগুলো বেচে দিয়ে তারা কখনই কমিউনিস্টদের কথা বলতে পারবেন না, হাড় হাভাতেদের পক্ষে গিয়ে নিজেদের কলমকে বন্দুক হিসাবে ব্যবহার করে শব্দ, বাক্য, ফর্ম ও কনটেন্ট দিয়ে অমানবিক ব্যক্তি মালিকানার দালালদের উপর দফায় দফায় কামান দাগতে পারবেন না।
উদয়ন ঘোষ তাই কোনোদিনও, শত আহ্বান ও প্রলোভন সত্তেও, বড় পত্রিকায় লিখে পেশাদারি লেখক হবার চেষ্টা করেননি। তার মুখে শুনেছি একবার তার লেখা ছাপা হবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার কোন নির্দিষ্ট লেখায় কি কি পরিবর্তন করলে তা ছাপার উপযুক্ত হবে শোনানো হয়। ঐ রাজনৈতিক কনটেন্ট ছেটে বাদ দিলেই তা ছাপার উপযুক্ত হবে শুনে তিনি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, তুরন্ত সে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তার অনেক গুণমুগ্ধ পাঠক তাকে অনেক বার বলেছেন আপনি কেন বড় কাগজে লেখেন না, আপনি কেন আপনার বই প্রকাশে অনাগ্রহী, ইত্যাদি, ইত্যাদি। অনেককে অনেক রকম উত্তর দিলেও আসল কারণ ছিল বড় কাগজের মানব-বিরোধি, কমিউনিজম-বিরোধি জনপ্রিয়, মনমাতানো ও এনটারটেইনিং (যাকে কেউ কেউ কমার্শিয়াল লেখা বলেন) লেখালেখি তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি লেখক কিন্তু তিনি কমিউনিস্টও এবং সে, উদয়ন ঘোষ, কোনোদিনও কমিউনিজম বাদ দিয়ে লেখার কথা ভাবতে পারেননি। লেখা বেচে নিজের আখের গোছাতে পারেননি। অথবা ঐ আখের গোছানোর জন্য লেখালেখি করেননি।
তবুও তিনি কি সত্যিই প্রতিষ্ঠান বিরোধী? এই বিষয় বিতর্ক উঠেছে বহু, এমনকি তার গুণমুগ্ধ লিটিল ম্যাগের পাঠক-লেখক-সম্পাদক মহলেও। বেশ মনে পড়ে, একবার তো তাকে ডেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রিতিমত বিচার সভাই বসিয়ে দিলেন এক দল পাঠক-লেখক-সম্পাদক। যথেষ্ট প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা না করার দায় তাকে তারা দোষী সাব্যস্তও করলেন। তিনি কোনোদিনই বুকে প্ল্যাকার্ড ঝোলানো, ইংরাজিতে যাকে বলে wearing on one’s sleeves বামপন্থায় অথবা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় বিশ্বাস করতেন না। তার বামপন্থা অঘোষিত, তার প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতাও অঘোষিত, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কমিটমেন্ট বা লেখালেখির মধ্যে দিয়ে কোন সামাজিক কর্তব্য পালন করাটাও ছিল অঘোষিত। কারণ তিনি মনে করতেন এই সব ঘোষনা করাটাই এক ধরনের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা, এক ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যা শেষ অবদি সেকটারিয়ান, যা স্বপক্ষের সৈন্যদের মধ্যেই বিভাজন ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, বাম ঐক্যের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
তাই তার লেখালেখির মধ্যে শুধুমাত্র অঘোষিত পক্ষ নেওয়াই ছিল, বিপক্ষের বিরুদ্ধে; এবং, সেই সৃষ্টির মধ্যে ছিল না কোন তকমা আঁটা রাজনৈতিক দলের নির্ধারিত চিন্তা, তা সে যত বৈপ্লবিকই দল হোক না কেন কারণ তিনি বুঝতেন যে কোন এক বা একাধিক নেতার চিন্তা তা যদি প্রকৃত অর্থে from the masses, to the masses প্রক্রিয়ায় উঠে না আসে তা’হলে তা আসলে সবসময়ই সেকটারিয়ান। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রয়োজনে বুকে তকমা আটা রাজনৈতিক দলের ধামাধারি করে রিয়ালপলিটিকের নোংরা জল ঘাটতেও পিছপা হননি তিনি। আরএসএস (ভাবা যায়?), আরএসপি থেকে শুরু করে সিপিআই, সিপিআইএম এবং শেষে সিপিআইএমএল সব রাজনৈতিক ঘাটের জল খেয়েছিলেন তিনি তার দিন বদলের তৃষ্ণা ও ক্ষুদা মেটাতে। এত ঘাটের জল খেয়েও কবীর সুমনের লাইন তার নিজস্ব স্বভাবের চিরাচরিত প্রথায় নিজের লেখায় পাঞ্চ করে আমাদের জানালেন পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনো গেল না।
কমিউনিস্ট উদয়ন ঘোষও তাই মার্কস সাহেবের মতই সর্বক্ষন doubt করতেন সবকিছুকে। তার লেখায় জানিয়ে দিলেন সিএমকে (চারু মজুমদারকে অথবা যার সাব-টেক্সট হল সশস্ত্র বিপ্লবের রাজনীতিকে) বিজ্ঞানমনস্ক না হলে পৃথিবীকে বদলানো যায় না। নিজের লেখায় ডকুমেন্ট করলেন সশস্ত্র বিপ্লবের রাজনীতির দুই পরিনতি – একদিকে পংকজদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিভ্রান্তি, অন্যদিকে অর্জুনদের ক্রিটিক সেই সব রাজনীতি সরবস্ব রাজনীতির যা কিনা অর্থনৈতিক এবং পারিবারিক কাঠামোকে না ভেঙ্গে শুধুই রাজনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। টের পেতে শুরু করলেন যে দিন বদলের প্রশ্নটা আদৌ শুধুই রাজনৈতিক নয় । পারিবারিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে বা উপেক্ষা করে শুধুমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল তা বন্দুকের নল দিয়েই হোক বা ব্যালট বাক্সের বুলেট দিয়েই হোক কিছু মানুষের ভাল থাকাকে অপরিবর্তিত রেখে দেয়।
বিজ্ঞান মনস্ক ছিলেন বলেই, গুরু হয়েও শিষ্যের মতামতকে গুরুত্ব দিলেন। আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রন্থটিতে এই নতুন মতকে শুধু ডকুমেন্ট করলেন কারণ তখনও তার নিজের সব doubt সম্পূর্ণভাবে যায়নি। এই পংকজ-অর্জুনদের বিভ্রান্তিকারী যাতায়াতে উন্মাদ হয়ে চলে গেলেন লুম্বিনি পার্কে। কিন্তু পাঠককে বলে যেতে ভুললেন না যেন সে, পাঠক, ঐ অর্জুনের লেখা critically পড়েন।
পরবর্তিতে স্বপনের ম্যাজিক রিয়ালিটি গ্রন্থে ফিরে আসলেন নতুন উদ্যমে, বিভ্রান্তিকারি উন্মাদনা কাটিয়ে উঠে। স্বভাবসিদ্ধভাবে জীবনানন্দের লাইন তুলে এনে লিখলেন তৃতীয়-চতুর্থ-আরো সব আন্তর্জাতিক গ’ড়ে-ভেঙে-গড়ে দীপ্তিমান কৃষিজাত জাতক মানব এসে যায়। মহান সিংহও আসে যায় অনুভাবনায় স্নিগ্ধ হয়ে। যদিনা সূর্যাস্তে ফের হয়ে যায় সোনালী হেঁইয়ালি – এই doubtটুকু পোষন করেও আবার নিয়ে আসলেন অর্জুনের সেই দলিল। এবার কিন্তু নিজেই ব্যাখ্যা দিলেন, ছোট ছোট টিকায় দলিলের কথায় কথায়। অর্জুনের positive বাক্যের শেষে উপসংহারে বললেন তবেই anti-people রাষ্ট্র মুছে যাবে, তার তল্পিতল্পাও মূল্যহীন হয়ে যাবে, তার সবরকমের রঙ-বেরঙের মাতব্বরি, ক্ষমতার লোভ, কিছু মানুষের কেবলি ভালো থাকা, বাকি মানুষদের কেবলি হেমন্তের অবিরল পাতার মতো উড়ে যাওয়া – সব শেষ হবে। শেষ হবার নয় মানুষের এই অবিরাম সুখানুসন্ধান!
অধ্যাপনা করেও, মহান কমিউনিস্ট তাত্তিক নেতা হয়েও, লেখক উদয়ন ঘোষ অথবা কমিউনিস্ট উদয়ন ঘোষ আজীবন কাটালেন ছাত্র হয়ে। ছাত্রদের থেকেও শিখে, যেখানেই শেখার কিছু আছে সেখান থেকেই শিখে। নোবেল পাওয়ার পরও মার্কোয়েজের লেখা পড়ার সুযোগ হয়নি তার, উদয়ন ঘোষের। কিন্তু এই অধমের প্ররোচনায় যখন ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিটিউড পড়লেন, দেখা গেল কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি মার্কোয়েজ গুলে খেয়েছেন। শুধু তাই নয়। একেবারে আত্মস্থ করে নিজের করে নিয়েছেন। নিজেও চিরকালই লিখতেন ঐ ম্যাজিক রিয়ালিটি কিন্তু এবার যেন একেবারে সচেতনভাবে তাই করতে লাগলেন। কবির সুমনের ক্ষেত্রেও তাই। যুবাদের আড্ডায়, বিশেষত যাদবপুর বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে তখন সুমন সবে নাম কিনতে শুরু করেছে – বৃহত্তর শ্রোতা বা পাঠকের কাছে তখনো পৌঁছায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অনুষ্ঠানের noise-এ ভরা distorted রেকর্ডিং শুনেই টের পেয়ে গেলেন সুমন একটি খনি – শব্দের খনি – বাক্যের খনি - লিরিকের খনি। নিজের উদ্যোগেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, বন্ধুত্ব পাতালেন। পরবর্তি সব লেখায় সুমনের লাইন আর তার, উদয়ন ঘোষের, বাক্য মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল।
অবশ্য এই কাজটি তিনি চিরকালই করে এসেছেন। অন্যের বাক্য নিজের বাক্যের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে এক অদ্ভুত গদ্যের সৃষ্টিকার তিনি। যে গদ্য একাধারে পদ্যও বটে। যে গদ্য পদ্যেরই মত দ্ব্যর্থক বা নিঃসন্দেহে একাধিক অর্থক। টেক্সট এবং সাব- টেক্সটের এক আশর্য খেলা – একই বাক্যের পরতে পরতে অনেক কন্টেন্ট। লেখা কখন নেহাতই পেটি বুর্জুয়া আত্মরতি আর কখন কমিউনিস্ট কামান দাগা তা গুলিয়ে যায়। তেমনি গুলিয়ে যায় কোন বাক্য তার আর কোন বাক্য মাওসে তুং, লিন পিয়াও, সরোজ দত্ত, চারু মজুমদার, বিনয় মজুমদার, প্রতুল মুখপাধ্যায়, সুমন চট্টপাধ্যায় (কবীর সুমন), জয়দেব, রাসেল সাহেব, ড্যানিয়েল বেল, শেলী, শেকস্পিয়ার, জীবনানন্দ, মরগ্যান, রবীন্দ্রনাথ, কডওয়েল, ডস্তয়ভস্কি, অর্জুন সেনের, অথবা কোন ইমেজ কাফকা, কামুর, কোন মন্টাজ ফেলিনি, বেয়ারিম্যান, আইজেনস্টাইন, ঋত্বিকের, তাও গুলিয়ে যায়। খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করলেও তিনি বিনীতভাবে জানিয়েছেন অজ্ঞাতসারে আরো অনেকের বাক্য তার বাক্য হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রচনায়। বিধগ্ধ লেখকের পাঠককেও বোধহয় বিধগ্ধ হতে হয় না হলে সেই লেখকের লেখা থেকে যায় শুধুমাত্র আকর্ষনীয় গদ্য, সেই লেখার ফর্ম ও কনটেন্টের প্রকৃত মূল্যায়ন অথবা বলা ভালো appreciation বা পূর্ণ উপলব্ধি করা অসম্ভব হয়ে যায়।
অনেকে বলেন উদয়ন ঘোষ নাকি obscure লেখক, তাকে বোঝা যায় না।
নিজেই লিখেছেন তথাকথিত গল্প লেখক আমি – কিন্তু গল্প লিখি কিনা এ-নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে। লোকে বলেনও, দূর মশাই, আপনার গল্পে গল্প খুঁজতে হয়রান হতে হয়। তাছাড়া গল্প হবে সরল, শুনলে বা পড়লেই বোঝা যাবে after all গল্প তো – কিন্তু মশাই আপনার গল্প সহজে বোঝা যায় না। গল্প থাকে না বলেই বোঝা যায় না। বিশ্বাস করুন, এও আমি বুঝি না ভালো। …আরো বিপাকে পড়ি যখন শুনি, আপনার একটি গল্পে অসংখ্য গল্প থাকে, গল্পকে আপনি ভৃত্য করে রাখেন, গল্প নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেন, তাদের নানা কাজে খাটান।
আমার বিনীত মতে উদয়ন ঘোষ এতটুকুও obscure লেখক নন। তার লেখা জটিল হতে পারে, ভুল বললাম – তার লেখা অবশ্যই জটিল কিন্তু obscure নয় কারণ তিনি খুব স্পষ্টভাবেই একটি গল্পই লিখেছেন সারা জীবন – যা আসলে গল্প নয় স্বপ্ন – রিয়ালিটি নয়, ম্যাজিক রিয়ালিটি, বাস্তব নয় কল্পনা -যে গল্পে আছে শুধু একটি স্বপ্ন, একটি কল্পনা – একদিন আসবে, একদিন আসবে যেদিন ধনীর পিঠের চামড়া দিয়ে গরীবের জুতো তৈরি হবে – ঐদিন আসছে। ঐদিন আসছে।
কিন্তু বিনয় মজুমদারের মতই তিনি বিশ্বাস করতেন শুধুমাত্র যা আছে তা কল্পনায় দেখাই সম্ভব, এর বিপরীতভাবে যা সব কল্পনা করি তাই সব আছে। তাই তার কল্পনালোকের স্বপন অথবা বিপ্লব কল্পনালোকের সব প্রাণীদের মতই জীবিত – মানুষরা তাদের দেখতে পায় কল্পনালোকে, স্বপ্নলোকে, ইহলোকে। তিনি বলতেন লেখার সময় মাইনর পয়েন্ট থকে মেজর পয়েন্টে যেতে হয় এবং তা করতে হয় সিনেম্যাটিকভাবে – মনটাজের সাহায্যে। তাই তার একটি গল্পে অসংখ্য গল্প থাকে – মাইনর পয়েন্টও থাকে আবার তার থেকে মেজর পয়েন্টও থাকে। অথচ কাটা কাটা মনটাজের বিভিন্ন দৃশ্যকে ব্যবহার করে তিনি ঐ একটি গল্পই, যা কিনা আসলে স্বপ্ন, মানুষকে স্পষ্টভাবে, এতটুকুও obscurity না এনে, দেখিয়ে যান। গল্পকে তিনি ভৃত্য বানিয়ে রাখেন, গল্প নিয়ে যা ইচ্ছে করেন, তাদের নানা কাজে খাঠান – মানুষকে ঘুম পাড়ানোর গান শোনাতে নয় – দিন বদলের রঙিন স্বপ্ন দেখাতে।
আর ঐ কারণেই তার লেখায় যত জটিলতা। বহুকামী হয়েও মোনগ্যামিক থেকে স্ত্রিবাক্যে লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে – যে স্ত্রীবাক্য আসলে সেই মুচলেকা যা নকশালবাড়ির সময় তাকে পুলিসকে দিতে হয়েছিল এই বলে যে তিনি আর কখনই সার্ফেসে দিন বদলের স্বপ্ন দেখাবেন না – কি করে সহজভাবে লেখালেখি করবেন? পরিবার বাঁচিয়ে, নিজের পিঠ বাঁচিয়ে, আখের গুছিয়ে কি আসলে লেখালেখি করা যায়? ওনার লেখালেখি, যা হল কমিউনিস্ট গণফৌজের অগ্রণী অংশের ধনীদের উদ্দেশ্যে এবং স্ট্যটাস কুয়োর বিরুদ্ধে কামান দাগা, আন্ডারগ্রাইন্ডে গিয়েই করতে হয় – যেখানে সার্ফেসের সহজ সরল আনায়েস নেই – যেখানে আছে আন্ডারগ্রাউন্ডের কঠিন, জটিল, বিপজ্জনক অস্তিত্ব।
তিনি জানতেন চতুর গেরিলা যোদ্ধার মত কামাফ্লাইজের আড়াল থেকে কামান দাগতে হবে। শব্দ ও বাক্যের আকর্ষনীয় শৈলিতে, একই পয়েন্টে থিসিস আর অ্যান্টিথিসিসের সর্বাত্মক উপস্থিতিকে ব্যবহার করে সার্ফেসে গল্প-গদ্যের কামাফ্লাউজ গায়ে চড়িয়ে তাকে অবিরাম লিখে যেতে হয়েছে কিছু আদ্যন্ত কমিউনিস্ট ও আদ্যন্ত বিপ্লবি অর্থাৎ কিছু আদ্যন্ত রাজনৈতিক দলিল। এই লেখা আন্ডারগ্রাউন্ডের ফকসহোল থেকে। তাই অবস্কিওর।
পেটি বুর্জুয়া নান্দনিক সাহিত্য-সংস্কৃতির দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে উদয়ন ঘোষ একজন দূর্বোধ্য লেখক। কিন্তু যাদের এখনো পালটে দেবার স্বপ্ন যায় নি তাদের উদয়ন ঘোষের লেখায় সেই স্বপ্নকে দেখতে পেয়ে চিনে নিতে এতটুকুও অসুবিধা হবার কথা নয় – এতো সেই ১০,০০০ বছরের পরিচিত গায়কের একঘেয়ে গান যা শুনে শুনে কান পচে গিয়েও সেই পচা কানেই আরেকবার, বারংবার শুনতে ইচ্ছে করে – পালটে দেবার স্বপ্ন যে আমাদের এখনো গেল না।
উপসংহারে বাকি থাকে আর একটাই কথা। সেই একঘেয়ে একই পয়েন্টে থিসিস আর অ্যান্টিথিসিস – বাস্তববাদের মাঝে আধ্যাত্মিকতা – যিশুখ্রীষ্ট, গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর অথবা চৈতন্য দেবের ধর্মীয় কথা বলতে গিয়েও যেখানে নাস্তিক উদয়ন ঘোষ বলে ফেলেন মানব ধর্মের কথা। তিনি যখন ইতিহাস ঘেটে প্রমাণ দেন যে এই ধর্মীয় ব্যক্তিরা আসলে কতটা মানুষের পক্ষে এবং ভগবানের বিপক্ষে, তাদের প্রকৃত ধর্ম আসলে কতটা বস্তুবাদি আর বিপরীতভাবে যা সব বস্তু তা সব স্পিরিচুয়াল তখন প্রশ্ন জাগে কমিউনিজম কি ত’হলে আধ্যাত্মিক? বস্তু কি স্পিরিচুয়াল?
পদার্থ বিজ্ঞানিরা কি বলেন? তাদের ভাষায় যখন বলেন বস্তু হল wave-particle duality এবং বস্তুর ধর্ম হল principal of uncertainty – ধরা গেলে ছোঁয়া যায় না – আবার ছোঁয়া গেলে ধরা যায় না – অর্থাৎ, বস্তু ধরা ছোঁয়ার বাইরে – তাহলে বস্তু কি spirit? দ্বান্দিক বস্তুবাদিরা যদি শুধু এক তরফা বস্তুই দেখতে পান, অন্তর্নিহিত স্পিরুচুয়াল দিকটা তাদের অদেখা থেকে যায় তা’হলেও উদয়ন ঘোষকে এবং তার লেখালেখিকে বোঝা অসম্ভব। অথচ যারা সর্বক্ষণ স্মরণে রাখেন যে সর্বত্র, সব সময়, সব স্থান, কাল ও পাত্রে একই পয়েন্টে থিসিস আর অ্যান্টিথিসিস উপস্থিত আছে, তাদের কাছে উদয়ন ঘোষের লেখা জলের মত স্বচ্ছ, খোলা আকাশের মত প্রাঞ্জল।
লেখক উদয়ন ঘোষ হয়ত obscure, avant garde অথবা বিপরীতভাবে post-modern, দুর্বোধ্য। কারণ আমাদের কোনো কিছুতেই ‘গা’ নেই – শীতের দুপুরে মিঠে রোদের আদুরে তাপে গাল গল্প পড়লে আমাদের অর্ধশায়িত বোধশক্তিতেও সেই সব গল্প-কবিতা বেশ বুঝতে পারি, ঘুম পাড়ানি কল্পলোকে দ্রুত প্রবেশ করে যাই যেখানে গল্পের গরু গাছে চড়ে। কিন্তু দুর্বোধ্য উদয়ন ঘোষের গদ্য, যে গদ্যে দাঁত ফোটালে দাঁত ভেঙ্গে যায় অথবা ভেঙ্গে যাবার যন্ত্রনার আশঙ্কা থাকে যদিও সে গদ্য প্রকৃত প্রস্তাবে সহজ, সরল, প্রাঞ্জল, সেই গদ্য আমাদের পেটি বুর্জুয়া মনষ্কের প্রাপ্য punishment স্বরূপ নিলে আমাদের শরির টের পেতে শুরু করে, আমরা ভাবতে শুরু করি। তার লেখা পড়ে বেশ টের পাই এখনো আমাদের কোনো সুখ নেই! তখন তার গদ্যের দীপ্তিতে স্পষ্ট দেখতে পাই দিন বদলের দিন এসে গেছে, আসছে, আসবেই! তখন অন্ধকার কেটে যায় আর নতুন উষার উজ্জ্বল উদয়নে আমরা তাকে পরিষ্কার দেখতে পাই!



1 Comment
January 26, 2008 at 12:16 pm
Arjunda; bangla lekha post korar paddhotita ektu janaben. Okay, write it in English so that I can refer some friends here.