Udayan Ghosh On Udayan Ghosh (In Bengali)

The following is Udayan Ghosh’s own views on his own writing. This was published as preface to the book উদায়ন ঘোষের ছোট গল্প (Udayan Ghosher Chhoto Galpo), 1995, Pratikshan Publications Private Limited, Kolkata. I believe my own writing is tremendously influenced by the views expressed here as well as the writings of this author. Hence, I present this to those readers of this blog site who can read Bengali.

ভূমিকা/লেখালেখি

লেখালেখি আমি করি বটে, তবে সে প্রসঙ্গে এক অক্ষরও লেখালেখির সময় এখনও আসেনি। যেভাবে সুনীল, শীর্ষেন্দু প্রমুখেরা লেখক এমনকি শঙ্খ ঘোষ যেমন আমি তেমনি। তবু যা করেছি অর্থাৎ ঐ লেখালেখি, সে-সব, বলতে কি মোটেই আমার নিজস্ব লেখালেখি নয়। আমার প্রাত্যহিকির সঙ্গে তার কোন মিল নেই। আমার স্বভাবের সঙ্গেও না। জয় যখন রানাঘাটে থাকত, তখন মনে হত সে প্রকৃতই কবির জীবন যাপন করছে। আমার জীবন-যাপন মোটেই লেখকের মত নয়। আমার স্ত্রী, মেয়ে, আত্মীয়স্বজন আমাকে লেখক বলে ভাবেন না। তারাই তো আমাকে সারাক্ষণ দেখছেন, অথচ তাদের চোখে আমি মোটেই লেখক নই। পরন্তু স্ত্রী-মেয়ে কেউ কেউ আমার আচরণ দেখে অথবা অপরের সঙ্গে আমার বোঝাপড়ার ব্যাপারে আমার mode of conduct দেখে বলেন, এই তুমি লেখক – তোমার প্রতিষ্ঠা হবে না।

বলা বাহুল্য, প্রতিষ্ঠা আমার হয়নি।

কতকগুলি হাস্যকর ব্যাপারও আছে। এই যেমন, খুব কাছে থাকেন, অথচ আত্মীয় নন। রক্তের সম্পর্ক নেই অথচ সুখে-দুঃখে পাশে আছেন, এমন সহকর্মী জানেন ভালোই আমি মাঝে মধ্যে লিখি, আমাকে গল্প বলেন – উদ্দেশ্য এই, ঐ গল্প শুনে আমি যাতে গল্প লেখার প্লট পাই। গল্প বলার পর দিন থেকে আমাকে উত্যক্ত করতে থাকেন, কি শুরু করলেন? মাস খানেক পিছনে লাগার পর একদিন হয়ত হতাশ হয়ে বললেন, দূর মশাই, আপনার দ্বারা কিস্যু হবে না, একটা গল্প লিখতে ছ মাস লাগে! হাতে প্লট পেয়েও লিখতে পারেন না?

এই প্লট, পাঠক, আমি বাস্তবিক বুঝি না। যেমন বুঝি না কনটেন্ট এবং তার সহদর সেই শৌখিন মেজাজি ফর্ম।

অধ্যাপনার সূত্রে ছাত্রদের নম্বর পাইয়ে দিতে ঐ প্লট, পিপল, কনটেন্ট, ফর্ম নিয়ে সজ্ঞা অনুযায়ী বিস্তর কথা বলেছি কিন্তু কোন প্রকৃত লেখককে দেখিনি, ঐ সবের ধারে কাছে যেতে। আমার গদ্য পড়ে হয়ত বললেন, আপনার ফর্ম ভারি অদ্ভুত। আপনি বড় ফর্ম-সচেতন। আপনার গদ্যে কনটেন্ট থাকে না তেমন, থাকলেও তাকে আপনি ডেলিবারেটলি ভেঙ্গেচুরে দেন – আর সেটাই আপনার ফর্ম।

এ সব শুনলে, বিশ্বাস করুন, আমি বোকা হয়ে যাই। কিছু বুঝতে পারি না। তথাকথিত গল্প লেখক আমি – কিন্তু গল্প লিখি কি না এ নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে। লোকে বলেনও দূর মশাই, আপনার গল্পে গল্প খুঁজতে হয়রাণ হতে হয়। তাছাড়া গল্প হবে সরল, শুনলে বা পড়লেই বোঝা যাবে after all গল্প তো – কিন্তু মশাই আপনার গল্প সহজে বোঝা যায় না। গল্প থাকে না বলেই বোঝা যায় না। বিশ্বাস করুন, এও আমি বুঝি না ভাল। …..আরো বিপাকে পড়ি যখন শুনি, আপনার একটি গল্পে অসংখ্য গল্প থাকে, গল্পকে আপনি ভৃত্য করে রাখেন, গল্প নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেন, তাদের নানা কাজে খাঠান।

সর্বাপেক্ষা বিপদে পড়ি যখন শুনি আপনার স্টাইল সন্দীপনের মত – সন্দীপন আমাকে সম্প্রসারিত করেন।

গদ্য তো মুখের ভাষা – আর আমি তো মুখের ভাষাতেই লিখি বলে ভাবি। আমার আর সন্দীপনের মুখের ভাষা এক নয়। সন্দীপনের মুখের ভাষা তথা গদ্য কত attractive – তুলনায় আমার মুখের ভাষা কত clumsy - আর আমার গদ্য, আমার চিঠি যারা পড়েন তারা জানেন ভাল, কত এলোমেলো, মোটেই স্মার্ট নয়।

অথচ শুনি, উদয়ন ঘোষের গদ্য কত স্মার্ট। শুনে শুনে এক সুয় মনে হয় আমি কি উদয়ন ঘোষ? তাছাড়া আমি তো উদয়ন ঘোষের মতো বধ্যভূমিতে যাই না। ন্যাড়া বেলতলায় যায় ক-বার। বুদ্ধিমান হলে ঐ একবার। আমি তো বুদ্ধিমান। আমার বড় মেয়ে বলে, বাবা ম্যানেজার। ম্যানেজার অর্থে – ম্যানেজ করি ভাল – আর তারই নাম তো বুদ্ধি – কি, বুদ্ধিমান পাঠক, ঠিক বলছি তো? স্ত্রী বলেন, চতুর। চাতুর্যের দ্বারা কোন মহৎ কাজই করা যায় না। আমি কি কোন মহৎ কাজ করি? অতএব আমি চতুর। চাতুর্যের দ্বারা লেখালেখি হয় কি? হয় না। অবশ্য লেখালেখি আদৌ কোন মহৎ কাজ নয়। স্ত্রী বলেন, তোমাদের সাহিত্য পলিউটেড। পাঠক বলেন, উদয়ন ঘোষের গল্পে প্রায়সই প্রতিশ্রুতি থাকে। কমিটেড। জীবনাশ্রয়ী।।…..শুনে ভাবি, আমি কি উদয়ন ঘোষ?

উদয়ন ঘোষকে দেখি পোকা পিঁপড়ের কামড় খেয়ে পড়ে আছে ফক্সহোলে আন্ডারগ্রাউন্ডে। আমি তো সিকিওরড সার্ফেসেই থাকি। আমি কি উদয়ন ঘোষ?

ভোরে আমি উঠি। ঘর প্রায় অন্ধকার থাকে। কিছু আলো না ফুটলে আমি লিখতে বসতে পারি না। আলো জ্বালি না ঘরের।

গান শুনি। স্পষ্ট দেখি, উদয়ন ঘোষ চেয়ারে বসে – চৌকির উপর এলোমেলো ছড়ানো বই, ইনফরমেশন নোটস ও ক্যাসেট প্লেয়ার – দেখি, গানের ভিতর দিয়ে উদয়ন ঘোষ ভুবন দেখছেন। …দেখে ভাবি, আমি কি উদয়ন ঘোষ? আমার স্ত্রী, মেয়ে, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী সকলেই জানেন, আমার গানে অর্থাৎ গা এবং গলা কিছুই নেই। অথচ টের পাই উদয়ন ঘোষের ভিতর। বাহির ছেড়ে ভিতরেতে, ঐ গান, অন্তঃপুরের তুমুল ঝড় তুলেছে। সে ঝড় অবশ্য শান্ত। টের পাওয়া যায়। তার হাওয়া আমার গায়ে লাগে না। তার শব্দও পাই না কোনো। সেই নৈঃশব্দ্য – ঐ নৈঃশব্দ্যে আমি স্পষ্ট দেখি শব্দ ভাঙ্গছেন। কেউ না বললেও আমি জানি কে তার বুকে বাঁশি বাজায়। তাকে আমি চিনি না। মাঝে মাঝে আমি টের পাই, সেও এক চিরস্তব্ধতা যেখান থেকে শব্দ, সেই সূত্রে বাঁশি এসেছিল। আমি কতজনকে জিজ্ঞেস করি ঐ চিরস্তব্ধতা কি – ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির কেউ তা সঠিক বলতে পারেন না।

নানান নামে ভোলায় তারা, নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে।

পাঠক বলেন, উদয়ন ঘোষ বলে কেউ নেই। আছেন জীবনানন্দের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, গানের রবীন্দ্রনাথ – বধ্যভূমির ডস্টয়ভস্কি, গ্যাম্বলার ডস্টয়ভস্কি। না বুঝে, কেবল মনটাজে ফেলিনি। বেয়ারিম্যান। Deep-এ না গিয়ে কামুর প্লেগ, কাফকার মেটামরফোসিসের কিছু ইমেজ। এহেন কমেন্টের সঙ্গেও আমার মিল নেই। কেননা ও-সব কিছুই আমার তেমন করে পড়া নেই।

স্ত্রী বলেন, ৩৫ বছর ধরে তোমাকে দেখছি, তুমি কখন পড়লে কামু-কাফকা-ডস্টয়ভস্কি – হ্যাঁ জীবনানন্দের কবিতার প্রথম পংক্তির তালিকা পড় আর হ্যাঁ, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোন। দিনরাত তো দেখি তর্ক করো।

পাঠক বলেন, উদয়ন ঘোষের গল্পে তর্ক নেই। কেবল শান্তনু অবনি অথবা স্বপন। পাঠক, বিশ্বাস করুন, আমি ঐ তিন জনকে আদৌ দেখি নি কোনোদিন। আমার আচরণও ঐ তিন জনের মতো না। শান্তনুর মতো অত সাবমিসিভ আমি নই, অবনির মতো আমি অত উচ্চ পদেও আমি নেই, স্বপনের মতো স্যাক্রিফাইসও আমার নেই।

প্রকৃতই উদয়ন ঘোষের লেখালেখি আমার লেখালেখি নয়। আমি সহবাসের পর স্বার্থমগ্ন হই। উদয়ন ঘোষকে দেখি সে তখন প্রবৃত্তির সঙ্গে দাবা খেলে। তাকে স্পষ্ট দেখেছি, সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে। সে সূর্য দেখেছি নিকশ কালো হিম।

আমারও নাম উদয়ন এবং শ্যামলি নামে বাল্য সখা ছিল, কিন্তু উদয়ন ঘোষের সদ্যজাত শ্যামলি-উদয়ন কথা একেবারে ভিন্ন বস্তু – পাঠক জানেন।

উদয়ন ঘোষকে আমি হাড় হতে দেখেছি, হাড় হাভাতেও হতে দেখছি আর আমি উদয়ন চর্ব-চোষ্য খাই। দুপুরে খাভার শেষে প্ল্যান করি রাত্রে কি খাব। তাজ হোটেলে একদিন খাবো বলে ভাবি।

স্ত্রী বলেন, খেয়ে খেয়ে তেল বেড়েছে তোমার – ঐ তেলে লেখা হয় না। দেখুন আমি কতো মোনোগ্যামিক, স্ত্রিবাক্যে লেখালেখি করি না আর – কিন্তু উদয়ন ঘোষকে দেখেছি কালেক্টিভ ম্যারেজের কথা বলতে। আমি কি পারি ঐ সব লিখতে? বস্তুত চিঠি ছাড়া। অ্যাপ্লিকেশান করা ছাড়া আর এই লেখাটি ছাড়া আমার প্রকৃতই লেখা হয় না।

আসলে উদয়ন ঘোষ অতনু। সে লিখেও ছিল অতনুর কথা। টের পেয়েছি, সে কেবল তার পূর্বপুরুষ ভাবে – আদিকালেরও আগে পুরুষ ছিল না কেউ – কেউ ছিল না – কিছু ছিল না, সে টের পায়। অথচ সে বহুকামী। শান্তনু অবনি ও স্বপনের স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে দেখেছি। চোখের পাতা সামান্য কাঁপেনি – আমি কি পারবো?

সে হত্যাকারী। শব্দকে হত্যা করে। উপমাকে হত্যা করে। রূপকল্পকে হত্যা করে। গল্পকে হত্যা করে।

জীবনকে হত্যা করে। এবং এই সব হত্যা করে সে অমর হতে চায়। যদিও মানুষ মরণশীল, উদয়ন ঘোষ অমর হতে চায়।

না, তার কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা লেখার, জানি না। এও জানি না, লেখাকে সে সামাজিক কর্তব্য মনে করে কি না। লেখালেখি কি আত্মরতি, এও সে জানে বলে মনে হয় না। কেবল বুঝি, উদয়ন ঘোষ আসলে সে – যার কোনো কিছুতে গা নেই – তাই crime করতে চায় – কেননা punishment পেতে চায় সে – punishment পেলে সে তার শরীর টের পাবে, ভাবে। ভেবে সে অন্ধকারে লীন হয়ে যায়।

পাঠক আমাকে ক্ষমা করুন, আমি তার লেখালেখির কিছু জানিনা – কেবল জানি, তার সাগরেও ক্রমশ লবণ জমছে – একদিন তার সব সমুদ্রের জল লবণ হয়ে যাবে।

প্রকৃতই অনেক লবণ ঘেটে পাওয়া গেছে এ মাটির ঘ্রাণ। সে সুবাদে তার গদ্য হয় – আমি সে মাটি চিনি না, বিশ্বাস করুন। তাই জানি না, ঐ লেখালেখি অথবা কেন লিখি।

Leave a Reply